স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় সংসদে জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারেন না।
রোববার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অনির্ধারিত আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। বেলা ১১টায় স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতেই বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান অনির্ধারিত আলোচনার জন্য দাঁড়ালে স্পিকার জানান, প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে তাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে।
প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিলে তিনি বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বর্তমান সংসদ স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়নি। বরং রাষ্ট্রপতির জারি করা একটি আদেশের মাধ্যমে এই সংসদ গঠিত হয়েছে, যা ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জারি করা হয়েছিল। তিনি সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের পুরো অংশ পড়ে শোনান এবং বলেন, ওই আদেশ অনুযায়ী নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা উল্লেখ রয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই পরিষদের অধিবেশন ডাকা হয়নি। বিষয়টি তার জন্য উদ্বেগের। তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো সেই পরিষদ গঠন করা হয়নি।
বিরোধীদলীয় নেতা তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, আদেশ অনুযায়ী সংসদের অধিবেশন যেভাবে আহ্বান করা হয়, ঠিক একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার কথা। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সেই অধিবেশন ডাকবেন। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা দুটি পৃথক ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছেন এবং জুলাই সনদের অধীনে বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য ইতিমধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথও নিয়েছেন। তাই তারা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ প্রত্যাশা করেন।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর স্পিকার সরকারি দলের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি স্পিকারের কাছে জানতে চান, সংসদের কোন বিধির আওতায় বিরোধীদলীয় নেতাকে সরাসরি ফ্লোর দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যদি কোনো জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করতে হয়, তবে মুলতবি প্রস্তাব বা সংক্ষিপ্ত আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট বিধি রয়েছে এবং সে অনুযায়ী নোটিশ দিতে হয়। তিনি জানতে চান, এ বিষয়ে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়েছে কি না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সংসদের অধিবেশন না থাকলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন, তবে সংবিধানের কোনো ধারা পরিবর্তন বা সংশোধনের মতো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে করা যায় না। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশটি না অধ্যাদেশ, না আইন—এটি মাঝামাঝি ধরনের একটি ব্যবস্থা। এর আগে তিনি এটিকে ‘নিউট্রাল জেন্ডার’ ধরনের আদেশ বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই আদেশকে তিনি একটি ‘আরোপিত’ আদেশ হিসেবে দেখেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই প্রায় সব কাজ করে থাকেন। বর্তমান সংসদের অধিবেশনও তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই আহ্বান করেছেন। কিন্তু সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন না এবং রাষ্ট্রপতিও সেই পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন না।
তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের নির্দিষ্ট কিছু অংশ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না—এ মর্মে আদালত ইতিমধ্যে রুল জারি করেছেন। ফলে বিষয়টি বিচার বিভাগের পর্যবেক্ষণের মধ্যেও রয়েছে। যদিও সংসদ সার্বভৌম, তবুও এমন কোনো আইন করা ঠিক হবে না যা পরে আদালতে গিয়ে সংবিধানবিরোধী হিসেবে বাতিল হয়ে যেতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে আগে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সংসদের বর্তমান অধিবেশনে ইতিমধ্যে ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয়েছে। এতগুলো আইনগত বিষয় নিয়ে আলোচনার মধ্যে সংবিধান সংশোধন বিল আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তবে কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাজেট অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন করা হতে পারে।
তিনি বলেন, সরকার গণভোটের রায়কে অস্বীকার করছে না এবং জনগণের মতামতকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে। তবে তা করতে হবে সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগ দিয়ে নয়, বরং সংবিধান, আইন ও বিধির মাধ্যমে পরিচালিত হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল এবং সরকার সেই দলিলের প্রতিটি শব্দকে সম্মান করে। কিন্তু জুলাই সনদের বাইরে কোনো আরোপিত আদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা যায় কি না—সেটি একটি বড় আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন। তাই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
পরে স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে উদ্দেশ করে বলেন, তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সংসদের সামনে তুলে ধরেছেন। তবে এত বড় সাংবিধানিক প্রশ্নের তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য তিনি যেন আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিশ দেন। নোটিশ পাওয়ার পর বিষয়টি বিবেচনা করে স্পিকার সিদ্ধান্ত দেবেন বলেও জানান।

