স্টাফ রিপোর্টার: নির্বাচনী প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখতে এখন থেকেই কঠোর পাহারাদারি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, কোনো জালিয়াত, ভোটচোর কিংবা অবৈধ প্রক্রিয়ার কারিগর যেন জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে—সেজন্য এখন থেকেই সর্বস্তরের মানুষকে সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ভোটের অধিকার রক্ষার এই দায়িত্ব পালন করে বিজয়ের মালা গলে পরিয়ে দিয়েই সবাই ঘরে ফিরবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে ঢাকা–১৩ আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াতের আমির। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা–১৩ আসনে মামুনুল হকের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা মাওলানা মাহফুজুল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, যিনি ঢাকা–১১ আসনে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতেই এবার ১১ দল একত্রিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা একত্রিত হয়েছি জুলাই যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষার আলোকে, একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। এই স্বপ্ন এখন দেশের ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ে লালিত।’ তিনি আরও বলেন, এই ঐক্য গড়ে উঠেছে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, মামলা বাণিজ্য ও অপরাধ জগতের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে। জনগণ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন বিজয় অবশ্যম্ভাবী—ইনশাআল্লাহ।
ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোনসহ সব ধরনের রেকর্ডিং ডিভাইস নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জুলাই মাসে যখন আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তখনও ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে অপরাধ আড়াল করা যায়, খুন-গুমকে বৈধতা দেওয়া যায়। আজ আবার আমরা দেখছি, কার ইশারায় নির্বাচন কমিশন সেই একই অন্ধকার পথে হাঁটার চেষ্টা করছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভেতরে ক্যামেরা, মোবাইলসহ সব ধরনের রেকর্ডিং নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে জনগণের চোখ ও কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
একই সমাবেশে নাহিদ ইসলামের দেওয়া ঘোষণার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজ সন্ধ্যার আগেই যদি এই প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার না করা হয় এবং জনগণকে স্পষ্ট বার্তা না দেওয়া হয়, তাহলে আগামীকাল নির্বাচন নয়—বরং নির্বাচনী প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করার ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হবে। এর সম্পূর্ণ দায়ভার সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, একটি পক্ষ নির্বাচনে হেরে যাওয়ার আশঙ্কায় গভীর হতাশায় ভুগছে। সেই হতাশা থেকেই তারা গুপ্তপথে নির্বাচন হাইজ্যাকের চেষ্টা করছে। বিভিন্ন এলাকায় গুন্ডা লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অস্ত্রের ভাণ্ডার গড়ে তোলা হচ্ছে এবং ভোটকেন্দ্র দখলের মাধ্যমে জনগণের ভোট কেড়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের আমির বলেন, ‘স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই—জুলাই যোদ্ধারা ঘুমিয়ে পড়েনি। তারা এখনো জেগে আছে। ইনশাআল্লাহ, সব অপকর্ম প্রতিহত করা হবে। জনগণের ভোট কেউ ছিনতাই করতে পারবে না।’ তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এ ধরনের দুঃসাহস দেখানোর চিন্তাও যেন কেউ না করে।
ঢাকা–১৩ আসনকে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ আসন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, দুঃখজনকভাবে কিছু অসৎ লোক এই এলাকাকে দীর্ঘদিন ধরে জর্জরিত করে রেখেছে। এখানে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, মাদকের রমরমা ব্যবসা, যুবসমাজকে বিপথে ঠেলে দিয়ে অস্ত্রবাজি ও দখলবাজিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। মামলা বাণিজ্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে তিনি আশ্বাস দেন, বিপথগামী তরুণদের বুকে টেনে নিয়ে সংশোধন করে মর্যাদাবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা গোষ্ঠীর স্বার্থে নির্বাচনে নামিনি। আমরা নেমেছি ১৮ কোটি মানুষের পক্ষে।’ তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, নির্বাচিত হলে কোনো দলীয় সরকার নয়, বরং জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। নির্দিষ্ট কোনো দলের বিজয় নয়—১৮ কোটি মানুষের সম্মিলিত বিজয়ই তাদের লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শেষে তিনি বলেন, একটি পক্ষ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ অতীতেও তাদের দেখেছে এবং এবারও তাদের লোভ ও ষড়যন্ত্র প্রত্যাখ্যান করবে। জনগণের পক্ষে এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার পক্ষে যারা আছে, জনগণ তাদেরই বেছে নেবে—এর আলামত ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

