ভোরের খবর ডেস্ক: ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)। শনিবার (১০ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে তারা বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে স্পষ্টভাবে ‘রেডলাইন’ বা লাল দাগ টেনে দেয়। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা সেনাবাহিনীর জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং এটি তাদের রেডলাইন। এই সীমা কোনোভাবেই লঙ্ঘন করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানায়, দেশের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর যেকোনো হামলার জবাব কঠোরভাবে দেওয়া হবে। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই’ এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড দমনে সব ধরনের শক্তি প্রয়োগ করা হবে।
আইআরজিসির এই অবস্থানের পাশাপাশি ইরানের নিয়মিত সামরিক বাহিনীও সতর্ক অবস্থানে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা জনসম্পত্তি, কৌশলগত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তেল ও গ্যাস স্থাপনা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। প্রয়োজনে সেনা মোতায়েন আরও বাড়ানো হবে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের শাসকদের উদ্দেশে নতুন করে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর এই সতর্কবার্তা এসেছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ‘সাহসী জনগণের’ পাশে রয়েছে এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর দমন-পীড়ন হলে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এড়াবে না। ট্রাম্প নিজেও এর আগে মন্তব্য করে বলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিক্রিয়া জানাতে পিছপা হবে না।
গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথমদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা রাজনৈতিক রূপ নেয়। বর্তমানে বিক্ষোভকারীরা সরাসরি ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার অবসান, রাজনৈতিক সংস্কার এবং মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলছে। বিভিন্ন শহরে ‘স্বৈরশাসন নিপাত যাক’ এবং ‘স্বাধীনতা চাই’—এ ধরনের স্লোগান শোনা যাচ্ছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে।
তবে ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এই বিক্ষোভ পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত নয়। সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলসহ বিদেশি শক্তি এই ‘দাঙ্গা’ উসকে দিচ্ছে এবং দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে নিয়মিতভাবে বলা হচ্ছে, বিক্ষোভের আড়ালে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার মদদ রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়, তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলের কারাজ শহরে একটি পৌর ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে ‘দাঙ্গাকারীদের’ দায়ী করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিরাজ, কোম ও হামেদান শহরে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজার দৃশ্য সম্প্রচার করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে। এসব সম্প্রচারের মাধ্যমে সরকার জনমনে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তৈরি করতে চাইছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, চলমান বিক্ষোভে এ পর্যন্ত কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন এবং শত শত মানুষ আহত ও আটক হয়েছেন। তবে সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা তুলনামূলক কম দেখানো হচ্ছে। ইন্টারনেট যোগাযোগ এখনো ব্যাপকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, যাতে বিক্ষোভের খবর এবং ভিডিও দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে না পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
পশ্চিম ইরানের এক প্রত্যক্ষদর্শী ফোনে রয়টার্সকে জানান, তার এলাকায় বিপ্লবী গার্ডস মোতায়েন করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালাচ্ছে। নিরাপত্তার কারণে তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছা জানান। তিনি বলেন, “রাস্তায় সশস্ত্র সেনা টহল দিচ্ছে, মানুষ আতঙ্কে ঘরে অবস্থান করছে।”
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত আরেক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করেছে, ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো’ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এতে কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন এবং বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়েছে। আইআরজিসির মতে, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অর্জন ধ্বংসের চেষ্টা চলছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করা অপরিহার্য। বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে দেওয়া ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ এবং দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে বলেও জানানো হয়। একই সুরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অধীনস্থ নিয়মিত সেনাবাহিনী ঘোষণা দিয়েছে, তারা জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত অবকাঠামো এবং জনসম্পত্তি রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে বিদেশে অবস্থানরত ইরানের সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভি বিক্ষোভকারীদের প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু রাস্তায় নামা নয়; শহরের কেন্দ্রগুলো দখল করে ধরে রাখার প্রস্তুতি নিতে হবে।” তিনি পরিবহন, তেল, গ্যাস ও জ্বালানি খাতের শ্রমিকদের দেশব্যাপী ধর্মঘটের আহ্বান জানান, যা সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানি বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্রও কঠোর জবাব দেবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “তোমরা যদি গুলি চালাও, আমরাও গুলি চালাব।” তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট এখন শুধু দেশের ভেতরের বিষয় নয়; এটি ক্রমেই একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে।

