ভোরের খবরন ডেস্ক: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস যখনই আন্দোলন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের কথা উঠে আসে, তখনই কিছু নাম বারবার অনিবার্যভাবে উচ্চারিত হয়। সেই তালিকায় একটি উজ্জ্বল নাম হলো শহিদুল ইসলাম বাবুল। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মী বা দলের নেতা নন, তিনি এক অনন্য সংগ্রামী চরিত্র, যিনি জীবনভর গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার এবং ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করে গেছেন।
তাঁর পথচলা ছিল আন্দোলন, মিছিল, স্লোগান, বারবার কারাবরণ ও নিপীড়নের মধ্য দিয়ে।১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০০৭ সালের ১/১১ সামরিক শাসনকাল, আবার ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনবঞ্চিত গণতান্ত্রিক আন্দোলন—প্রতিটি সংগ্রামে তাঁর উপস্থিতি ছিল অগ্রভাগে। কোনো দমননীতি বা শাসকের ভয়-ভীতি তাঁকে টলাতে পারেনি, বরং প্রতিটি বাধা তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সংগ্রামী মনোভাবকে আরও দৃঢ় করেছে।শহিদুল ইসলাম বাবুলের শৈশব ও কৈশোর থেকেই তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা অনুভব করতেন। ফরিদপুরের মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর কৈশোরকাল কেটেছে স্বাধীনতার পরবর্তী অস্থির রাজনৈতিক সময়ের মধ্যে—যখন দেশ একদিকে সামরিক শাসন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। ১৯৮২ সালে এরশাদের সামরিক শাসন যখন ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তরুণ বাবুল অনুভব করেন যে দেশের প্রকৃত মুক্তি আসবে জনগণের শক্তির মাধ্যমে। তিনি ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চেতনা আত্মস্থ করেন। স্থানীয়ভাবে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে নিজের নেতৃত্বগুণ, সাহসিকতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে সংগঠনের অপরিহার্য হয়ে ওঠেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও কৃষকদলের আন্দোলনে শহিদুল ইসলাম বাবুল ছিলেন সামনের সারির একজন সৈনিক। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ফরিদপুরের রাজপথে তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয় এক তরুণ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার পর কৃষক-শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বিশেষত, ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবিতে ফরিদপুরের গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য সভা-মিছিল তিনি করেছেন। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের ষড়যন্ত্র ঠেকাতে বিএনপি–জামায়াত জোটের আন্দোলনের সময় তিনি ফরিদপুরে নেতৃত্ব দেন হাজারো কৃষক-শ্রমিককে। পুলিশের লাঠিচার্জে রক্তাক্ত হন, গ্রেফতার হয়ে কয়েকদিন ফরিদপুর জেলা কারাগারে কাটান। তবুও তিনি মাথা নত করেননি। বরং কারাগারের অন্ধকার কক্ষ থেকেও তিনি আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, সহযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছেন এবং নতুন উদ্যমে রাজপথে ফেরার শপথ নিয়েছেন।স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় বাবুল ছিলেন অসাধারণ সাহসের প্রতীক। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর যখন স্বৈরাচার এরশাদ পতনের আন্দোলন তুঙ্গে পৌঁছায়, তখন ফরিদপুর শহরের মিছিলে নেতৃত্ব দেন তিনি। সেই সময়ে পুলিশের গুলিতে অনেকে আহত হলেও বাবুল ভাই অবিচলভাবে রাজপথে ছিলেন। মিছিল ভাঙতে লাঠি উঠেছে, টিয়ারশেল ছোড়া হয়েছে, গুলি বর্ষণ হয়েছে—কিন্তু বাবুল ভাইয়ের দৃঢ় কণ্ঠস্বর বারবার শোনা গেছে। ‘গণতন্ত্র ছাড়া বাঁচবো না।’ তাঁর এই অদম্য মনোভাবই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে একজন প্রকৃত সংগ্রামী নেতার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
শহিদুল ইসলাম বাবুলের সংগ্রামী পথচলা আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার এক বিশাল ভাণ্ডার। তিনি প্রমাণ করেছেন, রাজনীতি মানে কেবল ভোট বা পদ নয়, বরং তা হলো জনগণের অধিকার রক্ষার এক কঠিন যাত্রা। ছাত্রদল ও যুবদলের অসংখ্য তরুণ তাঁর দিকনির্দেশনা পেয়েছে। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘যুবসমাজই পারে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে।’ তাঁর এই মন্ত্রেই অসংখ্য তরুণ রাজনীতিতে জড়িয়েছে। আন্দোলন মানে শুধু স্লোগান নয়, বরং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ত্যাগ, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়—এটা তিনি তরুণ প্রজন্মকে কর্মে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।আজ যখন আমরা দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেখি, তখন শহিদুল ইসলাম বাবুলের মতো নেতার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন, ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতি—এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি অগ্রভাগে থেকে আন্দোলন করেছেন। ফরিদপুরের গ্রামে-গঞ্জে তিনি প্রতিদিন কর্মীদের নিয়ে সভা করেছেন, গণসংযোগ করেছেন। যদি তাঁকে মুক্তভাবে কাজ করতে দেওয়া হতো, তবে আন্দোলন আরও সুসংগঠিত হতো, কৃষকের দাবি আরও জোরালোভাবে রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছাতো, আর গণতন্ত্রের সংগ্রাম আরও দ্রুত এগিয়ে যেত। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর দমননীতি তাঁকে থামিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। যদিও তাঁকে শারীরিকভাবে বন্দি রাখা গেছে, কিন্তু তাঁর চিন্তা, তাঁর আদর্শ, তাঁর লড়াইকে কখনোই বন্দি রাখা যায়নি।
শহিদুল ইসলাম বাবুলের সংগ্রামী জীবন কেবল একটি ব্যক্তির গল্প নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি। এখানে আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, গণতন্ত্রের জন্য আত্মত্যাগ, জনগণের ভালোবাসা অর্জনের গল্প। ‘রাজপথ ছাড়া গণতন্ত্র আসে না’—এই স্লোগান তাঁর মুখ থেকে অসংখ্যবার উচ্চারিত হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যম থেকে জাতীয় দৈনিক—সবখানেই তাঁকে একজন দৃঢ় সংগ্রামী নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর পথচলা আমাদের শেখায়, সত্যিকারের নেতারা কোনোদিন হাল ছাড়েন না। যত বাধাই আসুক, যত কষ্টই হোক, তাঁরা জনগণের জন্য, দেশের জন্য শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত লড়ে যান।এখন সময় এসেছে শহিদুল ইসলাম বাবুলের সংগ্রামী পথচলাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার। যেন তাঁরা বুঝতে পারে রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা নয়, বরং তা হলো জনগণের সেবা ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা। তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে তরুণরা যদি এগিয়ে আসে, তবে এদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে।
শহিদুল ইসলাম বাবুল আজ কারাগারে—কিন্তু তাঁর চিন্তা ও সংগ্রাম মুক্ত। তিনি বর্তমানে একাধিক মামলায় অন্যায়ভাবে বন্দি। তবুও রাজপথে না থেকেও তিনি রাজপথের প্রতিটি কণ্ঠে আছেন, প্রতিটি স্লোগানে আছেন, প্রতিটি প্রতিবাদে আছেন। কৃষকের আঙিনায়, শ্রমিকের কণ্ঠে, তরুণদের স্বপ্নে তাঁর নাম উচ্চারিত হচ্ছে প্রতিদিন। তিনি নিছক একজন নেতা নন, তিনি এক সংগ্রামের প্রতীক, এক প্রজন্মের প্রেরণা।অতএব বলা যায়, অভিযান, আন্দোলন ও কারাবরণে গড়া শহিদুল ইসলাম বাবুলের এই সংগ্রামী পথচলা আগামী দিনের ইতিহাসে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সময় যতই এগিয়ে যাবে, তাঁর আত্মত্যাগ, তাঁর সাহস ও তাঁর অদম্য মনোভাব মানুষকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করবে। তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের নেতাদের শক্তি বন্দি রাখা যায় না। শহিদুল ইসলাম বাবুল তাই থাকবেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিনশ্বর নাম হিসেবে।

