

স্টাফ রিপোর্টার: ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর নুরুজ্জামান কাফিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এ নির্দেশ দেন ভারতে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের ব্যক্তিগত সহকারী মাসুদুর রহমান বিপ্লব।মঙ্গলবার (১০ মার্চ) অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান সামি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টে এ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়িচালক রাজ্জাক মাতব্বরের ছেলে মো. রুবেল আহমেদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাতেই এসব তথ্য সামনে এসেছে।
ফেসবুক পোস্টে জুলকারনাইন সায়ের খান লিখেছেন, “রুবেল আহমেদের কথা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। তিনি ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়িচালক রাজ্জাক মাতব্বরের ছেলে। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি কলকাতার পার্ক হোটেলে অনুষ্ঠিত বহুল আলোচিত একটি বৈঠকে রুবেল ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।”এই ঘটনার পর তাকে নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এ সময় রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। পরে তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এডিসি ও এসি মোহাম্মদপুর জোন এবং মোহাম্মদপুর থানার ওসির নেতৃত্বে পরিচালিত এক অভিযানে ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে রাজধানীর বছিলা মেট্রো হাউজিং এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ৩০ এপ্রিল ২০২৫ সালে রুবেল আহমেদ সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পান। তবে ঘটনার নতুন মোড় নেয় ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি। সেদিন মধ্যরাতে রাজধানীর কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে আবারও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।এই গ্রেপ্তারের কারণ হিসেবে জানানো হয়, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান রাহুল ওরফে ‘শুটার ফয়সাল’-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে রুবেলকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ কারণে তাকে ওই মামলায় আসামি করা হয়।
এরপর ২২ জানুয়ারি তাকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল কাদির ভূঁঞা ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত শুনানি শেষে ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।রিমান্ড শেষে ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইসমাইলের খাস কামরায় রুবেল আহমেদ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেই জবানবন্দির অংশ ফেসবুক পোস্টে সংযুক্ত করেছেন জুলকারনাইন সায়ের খান।
জবানবন্দিতে রুবেল আহমেদ উল্লেখ করেন, ছাত্রনেতা ওসমান হাদি এবং ইউটিউবার নুরুজ্জামান কাফিকে হত্যার নির্দেশ দেন ভারতে অবস্থানরত জাহাঙ্গীর কবির নানকের ব্যক্তিগত সহকারী মাসুদুর রহমান বিপ্লব।তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর বিপ্লব ফোনের মাধ্যমে কামরুজ্জামান নামের এক ব্যক্তিকে এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেন এবং সে সময় রুবেলও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে ওই নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া হয় ফয়সাল করিম মাসুদের কাছে, যিনি ‘শুটার ফয়সাল’ নামে পরিচিত।
রুবেলের জবানবন্দি অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও গালিগালাজ করার অভিযোগ তুলে শরিফ ওসমান হাদি ও নুরুজ্জামান কাফিকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এই কাজের জন্য ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করা হয়, কামরুজ্জামান রুবেল নামের আরেক ব্যক্তি ফয়সালের কাছ থেকে কিছু টাকা পাওনা ছিলেন। কিন্তু ফয়সাল সেই টাকা ফেরত দিচ্ছিল না। তাই পূর্বের সেই পাওনা টাকা আদায়ের অংশ হিসেবেও তাকে এই ‘কাজ’ দেওয়া হয়।রুবেল তার জবানবন্দিতে বলেন, বিপ্লব প্রথমে কামরুজ্জামান রুবেলকে দায়িত্ব দেন এবং তিনি পরে সেই দায়িত্ব ফয়সালকে দেন। মূল লক্ষ্য ছিল ‘হাদি’কে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া।
জুলকারনাইন সায়ের খান তার পোস্টে উল্লেখ করেন, রুবেলের দেওয়া জবানবন্দি থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় যে আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের ব্যক্তিগত সহকারী বিপ্লবের নির্দেশেই এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।তিনি আরও বলেন, ফয়সাল ও আলমগীরের মতো বিপ্লবকেও গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে বিপ্লব কার নির্দেশে এই হত্যার পরিকল্পনা করেন এবং এই পরিকল্পনার পেছনে কারা অর্থের জোগানদাতা ছিলেন— সেটিও তদন্তের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন।
জুলকারনাইন সায়ের খানের মতে, রুবেল আহমেদ যদি তার জবানবন্দিতে সত্য তথ্য দিয়ে থাকেন, তাহলে ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বরই তিনি জানতে পারেন যে শরিফ ওসমান হাদি ও নুরুজ্জামান কাফিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হচ্ছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত।তবে এত কিছু জানার পরও তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি জানাননি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই সময় তিনি আদালতের দেওয়া জামিনে মুক্ত অবস্থায় ছিলেন।ফেসবুক পোস্টে জুলকারনাইন সায়ের খান রুবেলের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির কপি, সংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং কয়েকটি লিংক কমেন্ট সেকশনে সংযুক্ত করেছেন বলে জানিয়েছেন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এ্যাড. নজরুল ইসলাম । ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ভোরের খবর,খন্দকার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান। অফিসঃ ১৫০ নাহার ম্যানসন (৫ম তলা) মতিঝিল বানিজ্যিক এলাকা,ঢাকা -১০০০। বার্তাকক্ষ-+৮৮০১৭৪৫-৩৫৪২৭৭