স্টাফ রিপোর্টার: আদেশ অমান্য করে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাওয়ার অভিযোগে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ঘটনায় ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন কাওসারকে ঘিরে এলাকায় তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনার পর নির্যাতিত গৃহবধূ বিবি জহুরার পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির পক্ষ থেকে তাকে আইনি, সামাজিক ও মানবিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জহুরার খোঁজখবর নিতে তার শ্বশুরবাড়িতে যান স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মশিউর রহমান বিপ্লব, ফেনী পৌরসভা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন ভূঞা এবং ধর্মপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার। তারা জহুরা, তার শাশুড়ি এবং স্থানীয়দের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন এবং ঘটনার বিস্তারিত শোনেন।
সাক্ষাৎ শেষে মশিউর রহমান বিপ্লব গণমাধ্যমকে বলেন, “বিবি জহুরা অন্যায়ের শিকার হয়েছেন। বিএনপি তার পাশে আছে এবং থাকবে। তার সংসার পুনঃস্থাপন, সংসার পরিচালনা এবং সন্তানদের ভরণপোষণের বিষয়েও আমরা সহযোগিতা করব।” তিনি আরও বলেন, নারী নির্যাতনের মতো ঘটনায় সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিবাদ হওয়া জরুরি।
এদিকে ফেনী জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার বলেন, “জহুরাকে সব ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়া হবে। প্রয়োজনে আদালতে মামলা পরিচালনাসহ সামাজিকভাবে তার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা পাশে থাকব।”
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার ধর্মপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন কাওসার মৌখিকভাবে স্ত্রীকে তালাক দেন বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে জনতার চাপের মুখে তিনি সাময়িকভাবে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে শুক্রবার দুপুরে তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন। স্থানীয়দের তোপের মুখে কাওসার নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং আলোচনার একপর্যায়ে জানান, একজন মুফতির পরামর্শ নিয়ে তিনি স্ত্রীকে আবার সংসারে ফিরিয়ে নিতে চান।
তবে ঘটনার পর থেকেই বিবি জহুরা তার শাশুড়ি ও তিন সন্তানকে নিয়ে শ্বশুরের বাড়িতেই অবস্থান করছেন। জহুরা গণমাধ্যমকে জানান, জীবনে প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেন। এ কারণেই তাকে মৌখিকভাবে তালাক দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “আমি ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে সমাধান চাই। আমি কাওসারের সংসারেই আমৃত্যু কাটাতে চাই।”
কাওসারের মা শরীফা খাতুন এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেন। তিনি বলেন, “আমার ছেলে বড় অপরাধ করেছে। তার শাস্তি হওয়া উচিত। যদি সে ঘরে ফিরতে চায়, তাহলে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়েই থাকতে হবে। জহুরাকে স্ত্রীর মর্যাদা না দিলে তাকে এই বাড়িতে জায়গা দেওয়া হবে না।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে ফেনী সদর উপজেলার মধুয়াই বাজার এলাকার নুর আহম্মদের মেয়ে বিবি জহুরার সঙ্গে কাওসারের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে আবদুল আলিম শুভ (১২), সাবিনা আফরিস ইভানা (৮) ও ইসরাত জাহান ইসমাত (৪) নামে তিন সন্তান রয়েছে। জহুরার পিতার পরিবার অসচ্ছল হওয়ায় সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতেন। অন্যদিকে কাওসার ফেনী শহরের রেলগেট এলাকায় বেডিং কারিগর হিসেবে কাজ করতেন। তবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত ঘরবন্দি অবস্থায় রয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এই ঘটনায় এলাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি নারী অধিকার ও ভোটাধিকার নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে এমন চরম সিদ্ধান্ত সমাজে নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

