স্টাফ রিপোর্টার: কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও আলোচিত ইসলামী বক্তা আমির হামজা বলেছেন, দেশের মূলধারার গণমাধ্যম, তথাকথিত সুশীল সমাজ, প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠন এবং কিছু নারীবাদী গোষ্ঠীর বেছে নেওয়া বা সিলেক্টিভ প্রতিবাদ ও স্লোগান গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। তাদের এই নীরবতা ও পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান জাতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ভোরে নরসিংদীর আলোচিত কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক কয়েকটি নৃশংস ঘটনার প্রেক্ষিতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।
ফেসবুক পোস্টে আমির হামজা লেখেন,
‘ফ্যাসিবাদ-উত্তর বাংলাদেশে আমাদের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল—দেশটাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর। আমরা চেয়েছিলাম পুরোনো বন্দোবস্ত, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চর্চা থেকে দেশকে মুক্ত করতে। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই আমরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।’
তিনি আরও লেখেন,
‘কিন্তু অতি দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে জানাতে হচ্ছে, গত কয়েক দিনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনায় আমাদের সেই স্বপ্নের ওপর যেন একের পর এক বালিচাপা পড়তে দেখছি। এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছি যে, বালিচাপার নিচ থেকে মাথা তুলে স্বপ্ন দেখাটাও কঠিন হয়ে উঠছে।’
তিনি বলেন, গত তিন দিনে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ভয়াবহ অশনিসংকেত গোটা জাতিকে নাড়া দেওয়ার মতো। এর মধ্যে প্রথম ঘটনাটি ঘটে নরসিংদীতে। প্রায় ১৫ দিন আগে স্থানীয় কিছু বখাটের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন এক নারী। ঘটনার পর ভুক্তভোগীর পরিবার বিচার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও বিচারিক সহায়তা তো দূরের কথা, বরং স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই ধামাচাপা ও তথাকথিত সমঝোতার পেছনে ‘একটি বিশেষ দলের’ কয়েকজন নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠে আসে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ওই নারীকে রক্ষা করতে পারেনি। বিচার চাওয়াই যেন তার সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। তাকে তার বাবার সামনেই জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং মরদেহ সরিষাক্ষেতে ফেলে রাখা হয়।’
অন্যদিকে, আরও ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজধানীর রামপুরা এলাকায় মাত্র ৬ বছরের এক কোমলমতি শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ভিক্টিমের পরিবার থানায় মামলা করতে গেলে প্রথমে কোনোভাবেই মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। পরবর্তীতে ক্ষুব্ধ জনতা থানা ঘেরাও করলে প্রশাসন বাধ্য হয়ে মামলা গ্রহণ করে। তবুও এখন শোনা যাচ্ছে, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ভিক্টিমের পরিবারকে নানাভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
আমির হামজা প্রশ্ন তুলে বলেন,
‘এমন নৃশংস ও বিভীষিকাময় ঘটনা কি আমরা ৫ই আগস্টের পর কল্পনাও করতে পেরেছিলাম? প্রশাসনের এমন দৈন্যদশা কেন? কেন তারা প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে পারছে না? এর পেছনে কারা বা কোন শক্তি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে—তা আমাদের সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরুন। প্রয়োজনে দেশের সকল মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমরা প্রতিবাদ গড়ে তুলব। কিন্তু কোনোভাবেই বাংলাদেশকে আবার পুরোনো বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে দেওয়া হবে না।’
তিনি আরও আক্ষেপ করে লেখেন,
‘সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—এত বড় ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আমাদের মূলধারার মিডিয়া, সুশীল সমাজ, প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠন এবং নারীবাদী প্ল্যাটফর্মগুলো প্রায় নিশ্চুপ। যেসব ইস্যুতে তারা প্রতিদিন স্লোগান তোলে, এই ঘটনাগুলোতে তাদের নীরবতা ও সিলেক্টিভ প্রতিবাদ আমাদের গভীরভাবে ভাবায় এবং প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে।’
সবশেষে তিনি বলেন,
‘আমি একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে নরসিংদী ও রামপুরার এই বর্বর ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
পোস্টের শেষাংশে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করে লেখেন,
‘আল্লাহ তায়ালা নিহত সকলের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে তাদের জান্নাতবাসী করুন—আমিন।’

