স্টাফ রিপোর্টার: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সাংবাদিক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের কার্ড ও যানবাহনের স্টিকার বিতরণ প্রক্রিয়ায় এবার প্রথমবারের মতো অনলাইন আবেদন বাধ্যতামূলক করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে এই নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার বাস্তবায়নে চরম গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। অনলাইন প্রক্রিয়ার ত্রুটির কারণে প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিকের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ্যে চলে আসায় দেশজুড়ে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ওয়েবসাইট pr.ecs.gov.bd-এ প্রবেশ করলে দেখা যায়, হাজার হাজার সাংবাদিকের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর, মোবাইল ফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা এবং জমা দেওয়া আবেদনপত্রের কপি সাধারণ দর্শকের জন্য উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। শুধু তালিকা নয়, ওয়েবসাইটের হোমপেজ থেকেই নির্দিষ্ট আবেদনকারীর প্রোফাইলে প্রবেশ করে তার ব্যক্তিগত তথ্য বিস্তারিতভাবে দেখার সুযোগও ছিল। ফলে যে কেউ খুব সহজেই এসব তথ্য ডাউনলোড বা অপব্যবহার করতে পারত।
বিষয়টি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাংবাদিক মহলে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তথ্য ফাঁসের খবর প্রকাশের পর কিছু সময়ের মধ্যেই ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ততক্ষণে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত তথ্য কতটা ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা চালুর আগে সাংবাদিক সংগঠন কিংবা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ করা হয়নি। এ কারণে শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়া নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। তথ্য ফাঁসের ঘটনায় সেই অসন্তোষ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। পরবর্তীতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাংবাদিক নেতাদের বৈঠকের পর গত বৃহস্পতিবার কমিশন অনলাইন পদ্ধতি বাতিল করে পূর্বের মতো সরাসরি কার্ড ও স্টিকার বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখার পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, “শুক্রবার আমরা অনলাইন সিস্টেম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আজ বিকেলে কীভাবে ওয়েবসাইটটি আবার উন্মুক্ত হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” পরে তিনি আরও জানান, “আজ বিকেলে ওয়েবসাইটের অ্যাডমিনের দায়িত্বে যিনি ছিলেন, তিনি ভুলবশত সাইটটি ওপেন করে দিয়েছিলেন। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।” বর্তমানে ওয়েবসাইটটি বন্ধ রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া অনুযায়ী, সাংবাদিকদের প্রথমে ওয়েবসাইটে লগইন করে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর প্রদান করতে হতো। এরপর একটি পাসওয়ার্ড সেট করে ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) যাচাইয়ের মাধ্যমে আবেদন সম্পন্ন করার নিয়ম ছিল। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় তথ্য সুরক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় পুরো ডাটাবেসই কার্যত উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যই নয়, পেশাগত ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। সাংবাদিকদের এনআইডি ও যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় পরিচয় চুরি, হয়রানি কিংবা নজরদারির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সংস্থার এমন অবহেলা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল প্রস্তুতি ও সক্ষমতাকে।
সব মিলিয়ে, এই ঘটনা অনলাইন সিস্টেমের নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা নীতি এবং সরকারি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ভোট ও গণমাধ্যম—উভয় ক্ষেত্রেই আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ এবং পরামর্শভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

