আবু সাঈদ রনি (শৈলকুপা) উপজেলা প্রতিনিধি: স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল বিদেশে স্বচ্ছল জীবনের। বলা হয়েছিল মাসে দেড় লাখ টাকা বেতন, পরিবারের দুঃখ ঘোচানোর সুযোগ। সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল প্রাণ—মানব পাচারকারীর নির্মম খপ্পরে পড়ে ক্যাম্বোডিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছেন ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বাহির রয়েড়া গ্রামের যুবক সোহাগ মোল্লা।নিহত সোহাগ মোল্লা স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল মোল্লার ছেলে। প্রায় ৮ মাস আগে তাকে ক্যাম্বোডিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, শৈলকুপার খুদ্র রয়েড়া গ্রামের জামিরুল শেখের ছেলে রয়েল শেখ—যিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্বোডিয়ায় অবস্থান করছেন—এই মানব পাচারের মূল হোতা।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, রয়েল শেখ কয়েক বছর ধরে এলাকার দরিদ্র ও বেকার যুবকদের বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ক্যাম্বোডিয়ায় পাচার করে আসছেন। প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে আদায় করা হলেও সেখানে পৌঁছে তাদের কোনো বৈধ চাকরি দেওয়া হয়নি। বরং অবৈধ কাজে বাধ্য করা হয়, দেওয়া হতো না নিয়মিত খাবার কিংবা বেতন। সামান্য প্রতিবাদ করলেই শুরু হতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।সোহাগ মোল্লার ক্ষেত্রেও ঘটেছে ঠিক তাই। অভিযোগ রয়েছে, গত মাসে তাকে গুরুতর নির্যাতন করা হলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে অবহেলার মধ্যেই তাকে রাখা হয়। অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ক্যাম্বোডিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন সোহাগ।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো—মৃত্যুর এক মাস পার হলেও এখনো পর্যন্ত সোহাগের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ নেয়নি অভিযুক্ত মানব পাচারকারী রয়েল শেখ। এতে চরম উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে নিহতের পরিবার।সোহাগের সঙ্গে একই ফ্লাইটে ক্যাম্বোডিয়া গিয়েছিলেন তার চাচাতো ভাই ইব্রাহীম। দীর্ঘ দুর্ভোগের পর গত পরশু তিনি দেশে ফিরে পরিবারের কাছে পুরো ঘটনার ভয়াবহ বর্ণনা দেন। তার বক্তব্যের পরই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।স্থানীয়রা জানান, রয়েল শেখের মাধ্যমে ক্যাম্বোডিয়ায় যাওয়া অনেক যুবকই সর্বস্ব হারিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। কেউ কেউ লোকলজ্জা ও ভয়ের কারণে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
এদিকে মানব পাচারকারী রয়েল শেখের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধানে নেমেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।একদিকে প্রবাসের মাটিতে নিঃশব্দে ঝরে পড়ছে তরতাজা প্রাণ, অন্যদিকে দেশে পড়ে থাকা পরিবারগুলো লাশ ফেরানোর আশায় বুক বাঁধছে। সোহাগ মোল্লার মৃত্যু যেন আবারও প্রশ্ন তুলে দিল—মানব পাচার বন্ধে রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত, আর কত প্রাণ গেলে থামবে এই নীরব হত্যাযজ্ঞ?

