নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি জানান, এ–সংক্রান্ত আপিল প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি ভিডিও বার্তায় তিনি এ কথা বলেন। পরে দৈনিক প্রথম আলোকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যেও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তাসনিম জারা। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী।
এর আগে শনিবার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ঢাকা-৯ আসনে তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। বিষয়টি নিশ্চিত করেন ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আজমল হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে জানান, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়ার জন্য মোট ভোটারের ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। তাসনিম জারার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে বেশি, প্রায় ৫ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়া হয়েছিল।
তবে যাচাই-বাছাইয়ের সময় দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে নির্বাচিত ১০ জন ভোটারের তথ্য পরীক্ষা করা হলে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে ৮ জন ঢাকা-৯ আসনের ভোটার হলেও বাকি ২ জন ওই আসনের ভোটার নন। নির্বাচনবিধি অনুযায়ী, প্রস্তাবক ও সমর্থক হিসেবে যাঁদের নাম দেওয়া হবে, তাঁদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট আসনের ভোটার হতে হবে। এই শর্ত পূরণ না হওয়ায় তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান মো. আজমল হোসেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী তাসনিম জারার আপিল করার সুযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে নিজের প্রতিক্রিয়ায় তাসনিম জারা বলেন, তিনি ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন এবং আজ ছিল মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের দিন। কিন্তু যাচাই শেষে তাঁর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হয়নি। তিনি জানান, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁরা আপিল করবেন এবং সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
তাসনিম জারা আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন যে কারণ দেখিয়ে মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে, সেটি হলো স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার শর্ত। এই শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি ছিল না; বরং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ভোটারের স্বাক্ষর তাঁরা জমা দিয়েছিলেন। সেখান থেকে ১০ জন ভোটারের তথ্য যাচাই করা হয় এবং ওই ১০ জনের পরিচয় ও স্বাক্ষর যাচাইয়ে কোনো জালিয়াতি পাওয়া যায়নি।
তবে সমস্যা তৈরি হয়েছে ওই ১০ জনের মধ্যে দুজনের ভোটার এলাকা নিয়ে। তাসনিম জারার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দুজন নিজেরাও জানতেন যে তাঁরা ঢাকা-৯ আসনের ভোটার। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের অনলাইন ডেটাবেজ অনুযায়ী দেখা যায়, একজনের ভোটার এলাকা শরীয়তপুর এবং অপরজনের ভোটার এলাকা ঢাকা-১১ আসনে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যায় তাসনিম জারা বলেন, একজন স্বাক্ষরকারীর বাসা খিলগাঁও এলাকায়, যেখানে ঢাকা-৯ ও ঢাকা-১১—দুটি সংসদীয় আসনের সীমানাই রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানতেন যে তিনি ঢাকা-৯ আসনের ভোটার এবং সে বিশ্বাস থেকেই স্বাক্ষর করেছেন। অপর একজনের জাতীয় পরিচয়পত্রে উল্লেখ ছিল তিনি ঢাকা-৯ আসনের ভোটার। তিনি কয়েক বছর আগে শরীয়তপুরে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে গিয়ে ঠিকানা সংশোধনের জন্য আবেদন করেছিলেন, কিন্তু সে আবেদনের কোনো হালনাগাদ তথ্য তিনি পাননি। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের অনলাইন ডেটাবেজে তাঁর ভোটার এলাকা শরীয়তপুর দেখানো হচ্ছে।
তাসনিম জারার মতে, এই দুজনের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না যে তাঁদের ভোটার এলাকা পরিবর্তিত হয়েছে বা তাঁরা প্রকৃতপক্ষে কোন আসনের ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত। তিনি অভিযোগ করেন, ভোটারদের এই ধরনের তথ্য যাচাই করার মতো কোনো সহজ বা নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশন সাধারণ নাগরিকদের জন্য রাখেনি।
এ প্রসঙ্গে তাসনিম জারার স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার জন্য নির্ধারিত ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের শর্ত পূরণ করতে তাঁরা ঢাকা-৯ আসনে প্রায় ৫ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর জমা দিয়েছিলেন। যাচাইয়ের জন্য নির্বাচিত ১০ জনের মধ্যে ৮ জনের তথ্য সঠিক পাওয়া গেছে। বাকি দুইজনের ক্ষেত্রে ভোটার এলাকা নিয়ে যে গরমিল দেখা গেছে, তা মূলত নির্বাচন কমিশনের ডেটাবেজ হালনাগাদ না থাকার ফল।
খালেদ সাইফুল্লাহ আরও জানান, যে দুইজন ভোটারের তথ্যে অসঙ্গতির কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, তাঁরা ইতিমধ্যে এ–সংক্রান্ত একটি লিখিত চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে তাঁরা উল্লেখ করেছেন, স্বাক্ষর দেওয়ার সময় তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁরা ঢাকা-৯ আসনের ভোটার ছিলেন বলে বিশ্বাস করতেন। তিনি বলেন, ‘পরবর্তী প্রথম কর্মদিবসেই আমরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করব।’
উল্লেখ্য, গত ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী আসন সমঝোতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। তবে ওই আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর সময়, ২৭ ডিসেম্বর এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন তাসনিম জারা। তিনি দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ছিলেন এবং ঢাকা-৯ আসনে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
দল ছাড়ার পর তাসনিম জারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৯ আসনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রী তাসনিম জারা মাত্র দেড় দিনের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন, যা নির্বাচনী অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট আসনের মোট ভোটারের কমপক্ষে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। সেই নিয়ম অনুসরণ করে তাসনিম জারা ২৯ ডিসেম্বর, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে তাঁর মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।
স্বাক্ষর সংগ্রহ ও মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তাঁর স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহ। তিনিও গত বুধবার এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন। খালেদ সাইফুল্লাহ এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং দলটির পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

