স্টাফ রিপোর্টার: যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর ‘ভিসা বন্ড’ বা মোটা অঙ্কের জামানত আরোপের সিদ্ধান্তকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তবে তিনি এ সিদ্ধান্তকে ‘অস্বাভাবিক’ মনে করছেন না বলেও স্পষ্ট করেন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে ভিসা বন্ড আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্য নয়। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রেই একই শর্ত প্রযোজ্য করা হয়েছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র মূলত সেসব দেশকে তালিকাভুক্ত করেছে, যাদের নাগরিকদের অনিয়মিত অভিবাসন ও অভিবাসন-সংক্রান্ত সমস্যাকে তারা দীর্ঘদিন ধরে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। সেই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের নামও এই তালিকায় এসেছে।
মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, “কিছু দেশ আছে, যাদের ইমিগ্রেশন নিয়ে প্রবলেম রয়েছে। আপনারা আমেরিকানদের কৌশল দেখেছেন—যারা সেখানে গিয়ে তাদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুবিধা নেয়, তাদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। কাজেই যুক্তরাষ্ট্র যদি কিছু দেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে, সেই তালিকায় বাংলাদেশ থাকবে—এটা আমার কাছে খুব অস্বাভাবিক মনে হয় না। তবে এটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক এবং আমাদের জন্য কষ্টকর।”
তিনি আরও বলেন, এই সমস্যাটি নতুন নয়; এটি বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। যদি এটি কেবল গত এক বছরের মধ্যে ঘটে থাকত, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের দায় আছে বলে মনে করা যেত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই প্রবণতা বহুদিনের। ফলে দায়দায়িত্ব যদি পলিসিগতভাবে কারও ওপর বর্তায়, তাহলে তা পূর্ববর্তী সব সরকারের ওপরই বর্তায়। তিনি স্বীকার করেন, এই পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন করা কোনো সরকারের পক্ষেই সহজ ছিল না, কারণ মানুষের অভিবাসনের প্রবণতা ও নড়াচড়া পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা কোনো সরকারেরই নেই।
অনিয়মিত অভিবাসন প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান তুলে ধরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই তারা অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তার ভাষায়, “সমাধান একটাই—আমাদের যদি অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধ করা যায়।” তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এখনও গণমাধ্যমে এমন খবর দেখা যায় যে কেউ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, অথবা হাবুডুবু খেয়ে কোনোমতে উদ্ধার হয়েছেন। এসব মানুষ নিঃসন্দেহে ভিকটিম এবং তাদের প্রতি মানবিক সহানুভূতি থাকা জরুরি। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, এসব ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইটে গত মঙ্গলবার জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদনের ক্ষেত্রে ৩৮টি দেশের নাগরিকদের সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড বা জামানত দিতে হতে পারে। এর আগে গত বছরের আগস্টে ছয়টি দেশের নাম দিয়ে এই নীতির সূচনা করা হয়। পরবর্তীতে আরও সাতটি দেশের নাম যুক্ত করা হয়। সর্বশেষ বাংলাদেশসহ আরও ২৫টি দেশের নাম এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, নতুন করে যুক্ত হওয়া অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রে আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে ভিসা বন্ডের এই শর্ত কার্যকর হবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ, শিক্ষা বা স্বল্পমেয়াদি অবস্থানের জন্য আগ্রহী বাংলাদেশি নাগরিকদের আর্থিক চাপ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভিসা বন্ড আরোপ বন্ধে সরকার কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ নেবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, বিষয়টি একেবারেই সাম্প্রতিক। সরকার প্রচলিত কূটনৈতিক পদ্ধতিতেই বিষয়টি এগিয়ে নেবে। তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করব যেন এই সিদ্ধান্ত থেকে বাংলাদেশ অব্যাহতি পায় বা অন্তত শর্তগুলো শিথিল করা যায়।”

