নিজস্ব প্রতিবেদক: পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও স্বাভাবিক ও কার্যকর পর্যায়ে নিয়ে আসার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা জানান।
সম্প্রতি সৌদি আরবের জেদ্দায় পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে তাঁর বৈঠক প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের একটি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, সম্পর্ক উন্নয়ন বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে—দুই দেশের মধ্যে একটি স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। গত এক বছরে সেই সম্পর্ক অনেকটাই স্বাভাবিক পর্যায়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতে আরও কিছু বাস্তবভিত্তিক অগ্রগতি সম্ভব। সেসব বিষয়ে অগ্রগতি হলে গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে মো. তৌহিদ হোসেন ও ইসহাক দারের মধ্যে দুই দফা টেলিফোনে আলোচনা হয়। এর ধারাবাহিকতায় চলতি সপ্তাহের রোববার সৌদি আরবের জেদ্দায় তাঁরা সরাসরি বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়, বাণিজ্য, কূটনৈতিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ যোগাযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে, দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের অংশ হিসেবে সামরিক ড্রোন কারখানা স্থাপনে চীনের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে একটি চুক্তি করার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ সরকার। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবসময় ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সরকার এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না, যাতে করে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে এবং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখেই এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তৌহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীগুলোকে আধুনিক ও কার্যকর রাখতে সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে বিমান বাহিনীর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যবহৃত অনেক এয়ারক্রাফট পুরোনো হয়ে গেছে এবং কিছু বিমান সার্ভিসেবল অবস্থায় নেই। এ কারণে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে হলেও নতুন সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সংগ্রহ করা অপরিহার্য। কোন দেশ থেকে কী পরিমাণ সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হবে—এ বিষয়গুলো নিয়ে সরকার পর্যায়ে বিস্তৃত আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে।
ভারতে বাংলাদেশের তিনটি মিশনে ভিসা সংক্রান্ত সেবা বন্ধ থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, অন-অ্যারাইভাল ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, তবে বাংলাদেশের জন্য ভারতীয় ভিসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। তিনি বলেন, নির্বাচনী সময়কে কেন্দ্র করে যেন কোনো ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে দেশে প্রবেশ বা অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে—সে কারণেই সাময়িকভাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করার পর দেশটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বাংলাদেশের আপত্তি ও উদ্বেগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো। তবে মাঠপর্যায়ে কী ধরনের কার্যক্রম চলছে বা সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কী পদক্ষেপ নিচ্ছে—সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। এ বিষয়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা আরও স্পষ্টভাবে জানাতে পারবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এটি একটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পিত প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং ধাপে ধাপে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলেও তিনি জানান।

