স্টাফ রিপোর্টার: ‘আমরা থানা পুড়িয়ে দিয়েছি, এসআই সন্তোষকে জ্বালিয়ে দিয়েছি’—এমন ভয়ভীতি ও হুমকিমূলক বক্তব্য দিয়ে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে প্রকাশ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডায় জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা সদস্য সচিব মাহদী হাসানের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি থানার ভেতরে সংঘটিত হলেও এর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে সর্বমহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার (২ জানুয়ারি) দুপুরের দিকে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, থানার ভেতরে ওসি আবুল কালামের সঙ্গে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে মাহদী হাসান নিজেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হিসেবে পরিচয় দেন এবং অতীতের সহিংস ঘটনার উল্লেখ করে হুমকিস্বরূপ বক্তব্য দেন। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা আন্দোলন করে গভমেন্টকে রিফর্ম করেছি। সেই জায়গায় প্রশাসন আমাদের লোক। আপনি আমাদের ছেলেকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে এসেছেন। আমাদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা করছেন। এখন বলছেন, আন্দোলনকারী হয়েছেন তো কী হয়েছে? আমাদের এখানে ১৭ জন শহীদ হয়েছে। আমরা বানিয়াচং থানাকে পুড়িয়ে দিয়েছিলাম। এসআই সন্তোষকে জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম। আপনি এসেছেন ঠিক আছে, কিন্তু কোন সাহসে এই কথা বললেন জানতে চাই।’
ভিডিওতে মাহদীর কণ্ঠ ও ভাষা ছিল উত্তেজনাপূর্ণ এবং তা অনেকের কাছে সরাসরি হুমকির শামিল বলে মনে হয়েছে। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন মহল থেকে এ ধরনের বক্তব্য ও আচরণ নিয়ে নিন্দা জানানো হয়। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তার সঙ্গে থানার ভেতরে এভাবে কথা বলা কতটা আইনসম্মত ও গ্রহণযোগ্য।
ঘটনার পর শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার ভোরে শায়েস্তাগঞ্জ থানা পুলিশ ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত এনামুল হাসান নয়নকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা সদস্য সচিব মাহদী হাসানের নেতৃত্বে কয়েকজন ছাত্র থানায় উপস্থিত হয়ে নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করে আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
পুলিশ প্রথমদিকে এনামুল হাসান নয়নকে ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং এ সময় ওসি আবুল কালামের সঙ্গে মাহদী হাসানের তর্কাতর্কি শুরু হয়। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের চাপ ও উত্তেজনার মুখে পুলিশ এনামুল হাসান নয়নকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জ আদালতের একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, ভিডিওতে যে ধরনের বক্তব্য শোনা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতে এই ঘটনায় কোনো মামলা হলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং তা অপরাধ প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।অভিযোগের বিষয়ে মাহদী হাসান নিজে বলেন, তিনি তখন খুবই রাগান্বিত অবস্থায় ছিলেন। সেই সময় কথা বলার মধ্যে ‘স্লিপ অব টাং’-এর কারণে এমন বক্তব্য বেরিয়ে গেছে। পরে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে তার কথাগুলো ঠিক হয়নি।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার ইয়াছমিন খাতুন বলেন, তিনি ভিডিওটি দেখেছেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন। শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসির কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, নয়ন নামের একজনকে মূলত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছিল। পরে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা নয়ন ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে ছিল—এমন ছবি ও ভিডিও প্রমাণ হিসেবে দেখান। তখন থানার ভেতরে কথাবার্তা হয় এবং সেই সময়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
আটক ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার জানান, নয়ন একসময় ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়, তবে বর্তমানে তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত নন। পুরো বিষয়টি পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

