

ভোরের খবর ডেস্ক: ভাষা আন্দোলনের ৭৩ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর। এখনও নানা আক্ষেপে দিনাতিপাত করছে ভাষা শহীদ আবদুস সালামের পরিবার। ফেনীর দাগনভূঞার সন্তান আবদুস সালামের পরিবারের আক্ষেপ, ৬৫ বছর পর ২০১৭ সালে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে তার কবর শনাক্ত হলেও সেটি সংরক্ষণে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। এ ছাড়া দাগনভূঞা বাজারের জিরোপয়েন্টকে সালাম চত্বর নামকরণ, ঢাকা-ফেনী-দাগনভূঞায় একটি সড়ক সালামের নামে নামকরণ, চার লেনের মহাসড়কের পাশে সালামের বাড়ি নির্দেশক তোরণ নির্মাণ, ভাষা শহীদ সালাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামকরণ করা হলেও সরকারিভাবে গেজেট প্রকাশ হয়নি। এদিকে স্থানীয়ভাবে শহীদ সালামের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তদারকির অভাব ও অবহেলায় নানা সমস্যায় জর্জরিত। ভাষা শহীদ আবদুস সালামের পরিবারের সদস্যরা দুঃখ নিয়ে জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা থাকলেও ভাষা শহীদদের ক্ষেত্রে নেই। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়লেও ভাষা শহীদদের বাড়েনি।ভাষা আন্দোলনের ৬৫ বছর পর ২০১৭ সালে শনাক্ত হয়েছিল শহীদ সালামের কবর। ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে শায়িত আছেন এই মহান ভাষাসৈনিক। ভাষা শহীদ আবদুস সালামের ছোট ভাই আবদুল করিম জানান, ৮ বছর আগে আজিমপুর গোরস্তানে সালামের কবর চিহ্নিত করা হলেও এখনও পর্যন্ত কবরটি সংরক্ষণ করা হয়নি।তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সালামের ক্ষেত্রে এত অবহেলা কেন? ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার লক্ষ্মণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় করা হয়। স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে আবদুস সালামের জন্মস্থান দাগনভূঞার মাতুভূঞা ইউনিয়নের লক্ষ্মণপুর গ্রামের নাম সালামনগর করা হয়। তার স্মৃতি রক্ষায় সালামনগরে গ্রন্থাগার ও জাদুঘর স্থাপন করা হয়। এরপর আবদুস সালামের গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে তার নামে করার দাবি ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে লক্ষ্মণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ভাষা শহীদ আবদুস সালাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামকরণ করা হয়। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষিকা নুরজাহান বেগম জানান, নামকরণের সাত বছর পার হয়ে গেলেও মন্ত্রণালয় থেকে এখনও পর্যন্ত গেজেট প্রকাশ হয়নি। এদিকে ভাষা শহীদ আবদুস সালামের বাড়ির পাশ দিয়ে চলে গেছে ফেনী-দাগনভূঞা-নোয়াখালী চার লেনের মহাসড়ক। দীর্ঘ ২১ বছর আগে এলাকাবাসী সড়কের পাশে সালামের বাড়ি নির্দেশক সাইনবোর্ড লাগায়। সড়কটি চার লেনে সম্প্রসারণের সময় ওই সাইনবোর্ডটি ভেঙে যায়, এরপর আর নির্মাণ হয়নি। এলাকাবাসীর দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ ভাষা শহীদ সালামের গ্রাম দেখতে আসেন। কোনো নির্দেশক না থাকায় দূরদূরান্তের এলাকা ঘুরতে হয় পর্যটকদের। ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়কে সালামনগর নির্দেশক তোরণ নির্মাণ দাবি করেছেন এলাকাবাসী। এ ছাড়া পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবিকর পরিপ্রেক্ষিতে ভাষা শহীদ আবদুস সালামের নামে দাগনভূঞা উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামটি ‘ভাষা শহীদ সালাম অডিটোরিয়াম’ নামকরণ করা হয়। নামকরণের দুই বছরের মধ্যে পরিত্যক্ত হওয়ায় তা নিলামে বিক্রি করা হয়। ভেঙে ফেলার ১৬ বছর পর নির্মিত হয় অডিটোরিয়ামটি। তবে সেখানে সালামের নাম বাদ দিয়ে উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম নামকরণ করা হয়েছে।শহীদ সালামের ছোট ভাই আবদুল করিম জানান, পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামের নাম পরিবর্তন করে ‘ভাষা শহীদ সালাম অডিটোরিয়াম’ নামকরণ করা হয়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তা পরিত্যক্ত হওয়ায় ভেঙে ফেলা হয়। একই স্থানে নতুন ভবন নির্মাণ হয়েছে। ওই অডিটোরিয়ামের নাম ‘ভাষা শহীদ সালাম অডিটোরিয়াম’ নামকরণের দাবি জানান তিনি।শুধু তাই নয়, ফেনীর ভাষা শহীদ সালাম স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসেই শুধু এ দুই স্থানের বাড়ে কদর, শুরু হয় পরিচ্ছন্নতা ও সাজসজ্জা। এ ছাড়া খবর রাখে না কেউ। স্থানীয়রা জানান, গ্রন্থাগারে রয়েছে সাড়ে ৩ হাজার পুরোনো বই। আর জাদুঘরে ভাষা শহীদদের একটি ছবি ছাড়া নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন। এদিকে গ্রাম্য পরিবেশ বিধায় সারা বছরই থাকছে এটি প্রাণহীন। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এলাকাটিকে দৃষ্টিনন্দন গড়ে তুলতে শিশুপার্ক স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন দাগনভূঞা উপজেলা চেয়ারম্যান দিদারুল কবির রতন।ফেনী জেলা পরিষদ ও এলাকাবাসী জানান, ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রামের নাম ‘সালামনগর’ করা হয়। প্রায় ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে শহীদ সালামের বাড়ির অদূরে নির্মাণ করা হয় ‘ভাষা শহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর।’ ২০০৮ সালের ২৬ মে স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগারটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।বর্তমানে শহীদ সালামের ছোট ভাই আবদুল করিম তার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন। ১৯৭৬ সালে সালামের পিতা ফাজিল মিয়া, ১৯৮২ সালে মা দৌলতের নেছা, ভাই সাহাব উদ্দিন, ১৯৯৯ সালে বোন কুরফুলের নেছা, ২০০২ সালে ভাই আবদুস সোবহান ও ২০০৭ সালে ছোট বোন বলকিয়তের নেছা মারা যান।শহীদ সালামের ছোট ভাই সুবেদার (অব.) আবদুল করিম জানান, সালামের স্মৃতিচিহ্ন বলতে কিছুই নেই। রক্তমাখা শার্ট আর একটি ছবি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য খাজা আহমদ নিয়ে আর ফেরত দেননি। আজিমপুর কবরস্থানে সালামের চিহ্নিত করা কবরটি যেন আজীবন সংরক্ষণ করা হয়।ভাষা শহীদ আবদুস সালামের ভাতিজা মো. নূরে আলম জানান, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের চাকরি ও পড়ালেখার ক্ষেত্রে কোটা থাকলেও ভাষা শহীদদের ক্ষেত্রে নেই, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়লেও ভাষা শহীদদের বাড়েনি। ভাষা শহীদ সালাম স্মৃতি পরিষদের সভাপতি সাংবাদিক শাহাদাত হোসেন শহীদ সালামের পরিবারের দাবি পূরণে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতার আহ্বান জানান।ফেনী জেলা পরিষদের প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানান, ২০২০ সালে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে স্থানীয় লুৎফর রহমান বাবলুকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরই ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়কে তোরণ নির্মাণ করা হবে বলে জানান তিনি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এ্যাড. নজরুল ইসলাম । ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | দৈনিক ভোরের খবর,খন্দকার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান। অফিসঃ ১৫০ নাহার ম্যানসন (৫ম তলা) মতিঝিল বানিজ্যিক এলাকা,ঢাকা -১০০০। বার্তাকক্ষ-+৮৮০১৭৪৫-৩৫৪২৭৭